
দীর্ঘ সাত মাস অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার পর অবশেষে নিশ্চিত হলো নজরুল ইসলামের মৃত্যুসংবাদ। বুধবার (৮ অক্টোবর) বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তার পরিবারকে ফোনে জানানো হয়—তিনি আর বেঁচে নেই।
রাজবাড়ীর চরপাড়া গ্রামের মৃত হাতেম আলী ফকিরের ছেলে নজরুল ইসলাম ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার বড় মেয়ে এ বছর রাজবাড়ী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে, দ্বিতীয় মেয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে এবং সবার ছোট দুই মেয়ের বয়স মাত্র ৬ ও ৫ বছর। স্বামীকে হারিয়ে চার কন্যাসন্তান নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্ত্রী আইরিন আক্তার।
পরিবারের সদস্যদের মতে, নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ল্যান্স কর্পোরাল পদে কর্মরত ছিলেন এবং ২০২০ সালে অবসরে যান। এর আগে তিনি ২০১৩ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কঙ্গোতে অংশ নেন। অবসরের পর কিছুদিন বাড়িতে থাকলেও পরে বাঁধাই মালের ব্যবসা শুরু করেন, কিন্তু সেখানে বড় ধরনের লোকসানে পড়েন। আর্থিক সংকটের সময়ে স্থানীয় দালাল ফরিদ হোসেন তাকে রাশিয়ায় ‘শপিং মলে নিরাপত্তাকর্মী’ চাকরির প্রলোভন দেখান।
পরিবারের আপত্তি উপেক্ষা করে নজরুল ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করেন। সেখানে পৌঁছানোর পর তাকে এক মাসের সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে বাধ্য করা হয় এবং পরে তাকে পাঠানো হয় ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে।
শুরুতে নিয়মিত ভিডিও কলে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন তিনি। একসময় স্ত্রীকে বলেন, “এখান থেকে ফেরা আমার পক্ষে সম্ভব না। যদি ফোন বন্ধ দেখো, ধরে নিও আমি আর নেই।”
পরিবারের সঙ্গে তার শেষ কথা হয় ৩০ এপ্রিল। তিনি জানান, ব্যাংকে টাকা পাঠাতে যাচ্ছেন, কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার ফোন করে বলেন, “টাকা পাঠানো হলো না, দ্রুত যেতে হচ্ছে। যদি ফোন বন্ধ থাকে, ধরে নিও আমি বেঁচে নেই।” এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ মেলেনি।
পরিবার সাত মাস ধরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দফতরে যোগাযোগ করেও কোনো সাড়া পায়নি। অবশেষে বুধবার বিকেলে মন্ত্রণালয় জানায়—নজরুল ইসলাম আর ফিরে আসছেন না।
শোকাহত স্ত্রী আইরিন আক্তার বলেন,
“আমি তাকে অনেকবার নিষেধ করেছিলাম যেতে, বলেছিলাম—সন্তানদের নিয়ে একসঙ্গে থাকব। কিন্তু সে বলেছিল ভালো বেতনের চাকরি আছে, সংসার ঠিক হবে। এখন আমি চার মেয়েকে নিয়ে কীভাবে বাঁচব?”
নজরুলের বড় ভাই অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট রহিম বলেন,
“দালাল ফরিদ আমাদের ভাইকে প্রলুব্ধ করেছে। আমরা বহু জায়গায় খুঁজেছি, সে সব সময় বলত—ও বেঁচে আছে। এখন শুনলাম, আর নেই। অন্তত লাশটা দেশে আনা হোক।”
অভিযুক্ত দালাল ফরিদ হোসেন দাবি করেন,
“আমি তাকে পাঠাইনি, শুধু যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছি। সে নিজেই জানতো রাশিয়ায় সেনাবাহিনীর লজিস্টিক হ্যান্ড হিসেবে যাবে। তার ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ ছিল।”
এ বিষয়ে রাজবাড়ী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মারিয়া হক বলেন,
“বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সম্পাদক ও প্রকাশক: রাশিদা ইয়াসমীন, ই-মেইল : news@kalukhalitimes.com, ফোনঃ +৮৮০১৭১১-৭৭৫৯২২
ঠিকানা : জোয়াদ্দার প্লাজা, চাঁদপুর বাসস্ট্যান্ড, কালুখালী, রাজবাড়ী ।
২০২৫ © কালুখালী টাইমস কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিতYou cannot copy content of this page