
ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই বাংলাদেশে এক ভিন্ন জগতের সূচনা। ভৌগোলিক মানচিত্রে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না থাকলেও, জুন-জুলাইয়ের এই সময়টাতে গোটা দেশ যেন রূপ নেয় এক টুকরো লাতিন আমেরিকায়। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার রঙে ভাগ হয়ে যায় পাড়া-মহল্লা, চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো। তবে এবারের ২০২৬ বিশ্বকাপের আবেগটা একটু অন্যরকম, একটু বেশি ভারী। কারণ, ক্যারিয়ারের একেবারে শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিজের রেকর্ড ষষ্ঠ ও সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ ধরে রাখার মিশনে নামছেন ফুটবল জাদুকর লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।
আগামীকাল ১৭ জুন (বুধবার) আমেরিকার ক্যানসাস সিটিতে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে নিজেদের শিরোপা ধরে রাখার অভিযান শুরু করবে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায়। ফলে এবার হয়তো ভক্তদের গভীর রাত পর্যন্ত টিভির সামনে বসে থাকতে হবে না, তবে উৎসবের আমেজ এতটুকু কমেনি। ভোর থেকেই চায়ের দোকানে ভিড়, নতুন জার্সি কেনা, পুরনো পরিসংখ্যান নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে তর্ক আর ছাদগুলোতে নীল-সাদা পতাকা ওড়ানোর ধুম লেগে গেছে। অফিস বা ক্লাসে যাওয়ার তাড়ার মাঝেই কোটি চোখ আটকে থাকবে টিভির পর্দায় কিংবা মোবাইলের লাইভ স্কোরে ।
কয়েকদিন পরেই ৩৯ বছরে পা দিতে যাওয়া মেসির সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্কটা কেবল ফুটবলীয় নয়, বরং অত্যন্ত ব্যক্তিগত। এই দেশের একটা পুরো প্রজন্ম বড় হয়েছে মেসিকে দেখে। ২০১৪ সালে মারাকানার ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে ট্রফির পাশ দিয়ে মেসির হেঁটে যাওয়ার সেই কান্না যেমন এ দেশের কোটি ভক্তকে কাঁদিয়েছিল, তেমনি ২০২২ সালে কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে ফ্রান্সকে হারিয়ে ট্রফি উঁচিয়ে ধরার রাতে আনন্দে কেঁদেছিল পুরো বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের ভক্তদের কাছে মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন; তিনি রংপুরের কোনো চায়ের দোকানের পোস্টার, পুরান ঢাকার ছাদের পতাকা, কিংবা বিনয় ও ধৈর্যের এক জীবন্ত প্রতীক। তিনি শিখিয়েছেন, বারবার হারলেও গল্প শেষ হয়ে যায় না।
১৯৬২ সালে পেলের ব্রাজিলের পর আর কোনো দল টানা দুইবার পুরুষদের বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। স্কালোনির দল এবার সেই কঠিন ইতিহাস ভাঙার লক্ষ্যে মাঠে নামছে। এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, দে পল, এনজো ফার্নান্দেজ, লাউতারো মার্তিনেজদের মতো কাতার বিশ্বকাপের চেনা মুখগুলোর পাশাপাশি এবার দলে এসেছে একঝাঁক নতুন তরুণ তুর্কি। তবে সব আলো যে লিওনেল মেসির ওপরেই থাকবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। গতি আর শক্তির আধুনিক ফুটবলে মেসি এখনও বল পায়ে ছন্দের জাদুকর, ফুটবলের শেষ বড় কবি।
বাংলাদেশের এই আর্জেন্টিনা প্রীতি এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের ফুটবল-উন্মাদনার ছবি ও ভিডিও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এতটাই আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল যে, এর সূত্র ধরে দীর্ঘ ৪৫ বছর পর ঢাকায় পুনরায় আর্জেন্টিনার দূতাবাস চালু করা হয়। হাজার মাইলের দূরত্ব, ভাষার দেয়াল—সবকিছুকে টপকে গেছে বল পায়ের জাদু।
২০২২ সালের মেসিকে দুনিয়া দেখেছিল পূর্ণতার খোঁজে, আর ২০২৬ সালের মেসিকে বাংলাদেশ দেখছে বিদায়ের আলোয় দাঁড়িয়ে। তিনি গোল পাবেন কি পাবেন না, আর্জেন্টিনা কাপ ধরে রাখতে পারবে কি পারবে না—সেই হিসাব তোলা থাক সময়ের কাছে। তবে বুয়েনস আইরেস বা রোসারিও না চিনেও, কেবল প্রিয় নায়কের পায়ের শেষ স্পর্শটুকু দেখার জন্য বাংলাদেশ আবারও বুকভরা ভালোবাসা নিয়ে তৈরি।
