
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় প্রধান অঙ্গীকার ছিল—বিগত সরকারের আমলের ‘অযৌক্তিক’ ও ‘অতিমূল্যায়িত’ উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় পুনর্মূল্যায়ন করে জনগনের অর্থের সাশ্রয় করা। কিন্তু দেড় বছরের মাথায় সরকারি নথি ও একনেক (ECNEC) সভার খতিয়ান বলছে ভিন্ন কথা। এই সময়ে মাত্র ১ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হলেও সংশোধনের নামে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এ পর্যন্ত ১৯টি একনেক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব সভায় মোট ৮৭টি চলমান প্রকল্প সংশোধন করা হয়েছে।
-
ব্যয় বেড়েছে: ৬৫টি প্রকল্পে।
-
ব্যয় কমেছে: মাত্র ৭টি প্রকল্পে।
-
ব্যয় অপরিবর্তিত: ১৫টি প্রকল্পে (তবে সময় বাড়ানো হয়েছে)।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৬৫টি প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ছিল ২ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধনের পর দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ, প্রকল্পের গড় ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৩৫.৬৭ শতাংশ।
সবচেয়ে বেশি ব্যয় বেড়েছে মেগা প্রকল্পগুলোতে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
-
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র: প্রকল্পের ব্যয় ২৬ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
-
ঢাকা সুপেয় পানি সরবরাহ (৩য় পর্যায়): ৪ হাজার ৫৯৭ কোটির প্রকল্প এখন দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ১৫ কোটিতে।
-
সাসেক সড়ক সংযোগ-২: এলেঙ্গা-রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণে বেড়েছে ৭ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা।
-
উপজেলা পর্যায়ে মিনি স্টেডিয়াম: সবচেয়ে বিতর্কিত এই প্রকল্পে ব্যয় ৪৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকায়।
ব্যয় বৃদ্ধির এই মহোৎসবের মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প। এই প্রকল্পে স্টেশন-প্লাজা ও জমি অধিগ্রহণ খাতের ব্যয় কমিয়ে প্রায় ৭৫৪ কোটি টাকা সাশ্রয় করা হয়েছে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতির একমাত্র বড় উদাহরণ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এই ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে দুই ধরণের মত লক্ষ্য করা গেছে:
পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সদস্য ও অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলামের মতে, বড় প্রকল্পগুলোর ব্যয় বাড়ার প্রধান কারণ ডলারের দাম বৃদ্ধি। বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো প্রকল্পে বিদেশি যন্ত্রপাতির দাম ডলারে পরিশোধ করতে হওয়ায় টাকার অঙ্কে ব্যয় বেড়েছে।
সাবেক পরিকল্পনা সচিব মো. মামুন আল রশীদ মনে করেন, এটি সরকারের নীতিগত ব্যর্থতা। তাঁর মতে, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সংস্থাগুলো অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে এবং নীতিনির্ধারক পর্যায়ে যথাযথ যাচাই-বাছাই করার মতো দক্ষ টিমের অভাব ছিল। ফলে ‘ব্যয় কমানোর বাগাড়ম্বর’ থাকলেও বাস্তবে পুরোনো সংস্কৃতিই বহাল রয়েছে।





