
সব ত্রাণ অন্য এলাকায় যাচ্ছে। আমার ঘর ভেঙে গেছে, কিন্তু কোনো সহায়তা পাইনি। আমাদের সামনে দিয়ে ট্রাকে ত্রাণ নিয়ে গেলেও চাইলেও দেয়নি।’—আক্ষেপের সুরে কথাগুলো বলছিলেন চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পুঁইছড়ি ইউনিয়নের প্রেমবাজার এলাকার বনাকাটা গ্রামের বাসিন্দা সাজেদা বেগম।
রোববার (১২ জুলাই) বিকেলে নিজের ভেঙে পড়া ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি জানান, সাম্প্রতিক বন্যায় তার বসতঘর ধসে গেছে। প্যারালাইজড স্বামীকে নিয়ে এখন পাশের একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। চরম দুর্ভোগে দিন কাটলেও এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সাজেদা বেগমের দাবি, অনেক এলাকায় বারবার ত্রাণ বিতরণ করা হলেও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের একটি বড় অংশ এখনও সহায়তা থেকে বঞ্চিত। একই অভিযোগ করেছেন বনাকাটা এলাকার আরও অনেক বাসিন্দা। স্থানীয়দের মতে, অন্তত ৩০০ পরিবার এখনও ত্রাণের অপেক্ষায় রয়েছে। বন্যার পানিতে এলাকার অধিকাংশ ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তলিয়ে গেছে কৃষিজমি ও মাছের খামার।
একই এলাকার নুরুন্নাহারও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। স্বামীহারা এই নারী অসুস্থ ছেলে ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে বসবাস করতেন একটি ছোট ঘরে। বন্যার পানিতে ঘরটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় গত পাঁচ দিন ধরে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি জানান, এখনও কোনো ত্রাণ সহায়তা পাননি।

নুরুন্নাহারের ভাষ্য, পাহাড়ি ঢলের পানিতে তার ঘরের জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে গেছে, এমনকি রান্নার ডেকচিও ভেসে গেছে। নতুন করে ঘর নির্মাণের সামর্থ্য তার নেই। স্থানীয়দের মতে, এলাকার সবচেয়ে অসহায় পরিবারগুলোর মধ্যে নুরুন্নাহারের পরিবার অন্যতম, তাই তার মতো মানুষদের আগে সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন ছিল।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এবারের বন্যা শুধু টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে নয়, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতাও বড় ভূমিকা রেখেছে। তাদের দাবি, জলকদর খাল ও এর সঙ্গে সংযুক্ত খালগুলোতে মোট ২৪৬টি স্লুইসগেট রয়েছে। এর মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনুমোদিত স্লুইসগেট মাত্র ৮৯টি, বাকি ১৫৭টি স্থানীয়ভাবে নির্মিত এবং অনেকগুলোর ওপর কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনুমোদিত স্লুইসগেটগুলোর একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে, আবার কিছু গেট বন্ধ থাকায় পানি স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশন হতে পারেনি। ফলে বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে এবং উপজেলার প্রায় চার লাখ মানুষ বন্যার দুর্ভোগে আক্রান্ত হন।

বন্যায় অসংখ্য ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ভেসে গেছে মাছের খামার, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি। গৃহহীন হয়েছেন বহু মানুষ। সংশ্লিষ্ট ঘটনায় শিশুসহ চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
যদিও বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে, তবুও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ এখনো কাটেনি। অনেক পরিবার এখনও ভাঙা ঘর ছেড়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। তাদের অভিযোগ, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকেই এখনো প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও পুনর্বাসন সহায়তার অপেক্ষায় রয়েছেন।





