
২০২৫ সালেও বাংলাদেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতির আশানুরূপ কোনো উন্নতি হয়নি; বরং কিছু ক্ষেত্রে এর অবনতি ঘটেছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) বার্ষিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে দেশে ‘মব সন্ত্রাস’ বা গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৯৭ জন, যা বিগত বছরের তুলনায় অনেক বেশি। আজ বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
উদ্বেগজনক ‘মব সন্ত্রাস’ আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মব সন্ত্রাসে ১২৮ জন নিহত হলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯৭ জনে। কোনো প্রমাণ বা তদন্ত ছাড়াই কেবল সন্দেহ ও গুজবের ওপর ভিত্তি করে মানুষকে পিটিয়ে হত্যার সংস্কৃতি জেঁকে বসেছে। এর মধ্যে রংপুরের তারাগঞ্জে ভ্যানচোর সন্দেহে জুতা সেলাইকারী রুপলাল ও চালক প্রদীপ দাসের হত্যাকাণ্ড ছিল অন্যতম নৃশংস। আসক বলেছে, এসব ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা এবং অপরাধীদের বিচার না করার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
কারা হেফাজতে মৃত্যু ও বিচারবহির্ভূত হত্যা ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন কারাগারে ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৬৯ জনই ছিলেন হাজতি। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সর্বোচ্চ ৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া, কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন ৩৮ জন। এর মধ্যে ১২ জন পুলিশি হেফাজতে মারা গেছেন।
রাজনৈতিক সহিংসতা ও দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালে দেশে ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যাতে নিহত হয়েছেন ১০২ জন। বিশেষ করে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ছিল শীর্ষে—দলের নিজেদের মধ্যে হওয়া ১৯২টি সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ৩৯ জন। এছাড়া আওয়ামী লীগ-বিএনপি এবং বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
গণমাধ্যম ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ২০২৫ সালে সাংবাদিকদের জন্য একটি অন্ধকার বছর হিসেবে চিহ্নিত করেছে আসক। বছরজুড়ে ৩৮১ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। ১৮ ডিসেম্বর ‘প্রথম আলো’ ও ‘ডেইলি স্টার’ ভবনে নজিরবিহীন হামলা ও অগ্নিসংযোগকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর ‘জঘন্যতম হামলা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অন্যদিকে, হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর অন্তত ৪২টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, যাতে ৩৩টি ঘরবাড়ি ও ৬৪টি প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে।
বিশিষ্টজনদের বক্তব্য আসকের এই প্রতিবেদন প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, “মব সন্ত্রাসসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা কমাতে না পারা বর্তমান সরকারের ব্যর্থতারই প্রতিফলন।” আসকের সিনিয়র সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবীর বলেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে বলপ্রয়োগ ও জবাবদিহির ঘাটতি আইনের শাসনের ওপর আস্থা আরও দুর্বল করেছে।”





