
দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকতার জীবন্ত কিংবদন্তি, বিবিসির সাবেক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক স্যার মার্ক টালি আর নেই। রোববার (২৫ জানুয়ারি, ২০২৬) ভারতের নয়াদিল্লিতে ৯০ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী সতীশ জ্যাকব বিবিসির কাছে এই প্রয়াণের খবর নিশ্চিত করেছেন।
এ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন পাকিস্তানি সামরিক জান্তার কঠোর সেন্সরশিপের কারণে অবরুদ্ধ পূর্ব পাকিস্তানের প্রকৃত চিত্র বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছানো ছিল প্রায় অসম্ভব। সেই কঠিন সময়ে দিল্লির ব্যুরো প্রধান হিসেবে মার্ক টালি প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সীমান্তের ওপার থেকে নিয়মিত তুলে ধরেছেন যুদ্ধের ভয়াবহতা, শরণার্থী শিবিরের আর্তনাদ আর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা।
গবেষক ও সাংবাদিক আফসান চৌধুরী স্মৃতিচারণ করে বলেন, “তখন বাংলাদেশের মানুষের কাছে বিবিসি মানেই ছিল মার্ক টালি। গ্রামের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে মুক্তিযোদ্ধারা—সবার সকাল-সন্ধ্যা কাটত রেডিওতে তাঁর কণ্ঠস্বর শোনার অপেক্ষায়। তাঁর বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচার ছিল একাত্তরের অবরুদ্ধ মানুষের একমাত্র আশার প্রদীপ।”
ইংরেজ পরিবারে জন্ম নিলেও মার্ক টালির নাড়ির টান ছিল দক্ষিণ এশিয়ায়। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় দিল্লিতে বিবিসির প্রধান হিসেবে তিনি ইতিহাসের অনেক সন্ধিক্ষণের সাক্ষী ছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধীর হত্যাকাণ্ড, জুলফিকার আলী ভুট্টোর ফাঁসি, আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসন এবং শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের মতো বড় বড় ঘটনা তিনি কভার করেছেন। তবে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে তিনি ঠাঁই করে নিয়েছিলেন একাত্তরের ‘অঘোষিত মুখপাত্র’ হিসেবে।
মুক্তিযুদ্ধে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করে। ২০১২ সালে সেই সম্মাননা গ্রহণ করতে তিনি শেষবারের মতো ঢাকায় এসেছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজ ও রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
ভারতের প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নয়াদিল্লিতেই বসবাস করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে বিশ্ব সাংবাদিকতার একটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল।





